মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

কালীগঞ্জ উপজেলার পটভূমি

 

 

কালীগঞ্জ উপজেলার পরিচিতি

 

ভূমিকাঃস্বচ্ছ সলিলা শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকায় ভাওয়াল পরগনার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ঘেঁষে অবস্থিত একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ কালীগঞ্জ। দক্ষিণে পলিসমৃদ্ধ সমতল ভূমি, উত্তরে ভাওয়াল গড়ের অসমতল ভূ-স্তর, সর্বত্র অসংখ্য ছোট বড় খাল-বিল ও গাছ-গাছালি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে করেছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রমন্ডিত।

 

নামকরণঃইতিহাস থেকে জানা যায়, নদী সংলগ্ন বাণিজ্য কেন্দ্র সাধারণত ‘‘গঞ্জ’’ নামে পরিচিত ছিল। আর শক্তি সাধনার পীঠস্থান বঙ্গভূমি অবহমান কাল ধরেই শক্তিদেবী কালীর নামের সাথে যুক্ত করেছে অসংখ্য জনপদকে। স্থানের নামকরণের এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে কালীগঞ্জের নামকরণের যথার্থতা প্রতিপন্ন হয়। কেননা কালীগঞ্জ সদরে শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী ঐতিহাসিক হাট ও কালীমন্দির আজও সেই তথ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। অবশ্য এ সম্পর্কে ভিন্নমতও প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করে কালীগঞ্জের নামকরণ হয়েছে ভাওয়াল পরগণার প্রতাপশালী সামন্ত রাজা কালীনারায়ণ রায়ের নামানুসারে। 

 

অবস্থান ও আয়তনঃরাজধানী শহর সংলগ্ন টঙ্গী শিল্প অঞ্চণের পূর্বে ২০ কিঃমিঃ দূরে ঐতিহ্যবাহী মসলিন কটন মিল ও তাঁত সমৃদ্ধ ছায়া-ঢাকা, পাখী-ঢাকা জনপদ কালীগঞ্জ উপজেলা। কালীগঞ্জ উপজেলার অবস্থান ২৩ ৫২৩র্ হতে ২৪ ২র্ উত্তর অক্ষাংশ এবকং ৯০ ২৮র্ হতে ৯০ ৩৯র্ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। গাজীপুর জেলার জেলার মোট ভূমির শতকরা ১০.৫৩ ভাগ নিয়ে সর্ব ক্ষুদ্র উপজেলা কালীগঞ্জ। ২১৭.৩৪ বর্গ কিঃমিঃ আয়তন বিশিষ্ট ও উপজেলার উত্তরে কাপডাসিয়া, দক্ষিণে রূপগঞ্জ ও পলাশ, পূর্বে পলাশ, পশ্চিমে রূপগঞ্জ, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর উপজেলা। পূর্ব-দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী আর পশ্চিমে বালু নদীর অবস্থান আুপজেলার মনোরম আবহাওয়া ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

প্রশাসনিক ইতিহাসঃ১৯৪৭ সালে ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় কালীগঞ্জ থানা। ১২ টি ইউনিয়ন হল কালীগঞ্জ সদর, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মোক্তারপুর, বাড়িয়া, জামালপুর, বাহাদুরসাদী, ঘোড়াশাল, জিনারদী, চরসিন্দুর, গজারিয়া এবং ডাঙ্গা। এর মধ্যে ঘোড়াশাল, জিনারদী, চরসিন্দুর, গজারিয়া এবং ডাঙ্গা ইউনিয়ন পলাশ পুলিশ ফাঁড়ির অধীনে ছিল।

 

১৯৮২ সালে কালীগঞ্জ সদর জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মোক্তারপুর, বাড়িয়া, জামালপুর, বাহাদুরসাদী এই ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় কালীগঞ্জ উপজেলা। বাকী ৫টি ইউনিয়ন নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় অন্তর্বূক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে বাড়িয়া ইউনিয়নটি গাজীপুর সদর উপজেলা এবং রূপগঞ্জের তুমুলিয়া ও নাগরী ইউনিয়ন দুটি কালীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভক্ত ২য়। অর্থাৎ বর্তমানে কালীগঞ্জচ সদর, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মোক্তারপুর, জামালপুর, বাহাদুরসাদী, তুমুলিয়া ও নাগরী এই ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা গঠিত।

 

 

 

 

 

জনবসতির ইতিবৃত্তঃপ্রাচীন বঙ্গ জনপদের অন্তর্বূক্ত জনবসতি এই অঞ্চলে সুপ্রাচীন কাল থেকেই ছিল তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বিজিত ও বিতাড়িত লক্ষণ সেন ও তার বংশধররা দীর্ঘ দিন পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছিল। এ সময় অত্র অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরে বাংলায় মুসলিম রাজত্বকালে গাজীপুর অনেকগুলো চেদি রাজ্যে বিভক্ত হয়। কালীগঞ্জ ছিল স্বাধীন সামন্ত রাজ্যের রাজা খাইডা ডোসকার অধীনে। এই চেদি রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মামলম্বী কিছু লোক পাওয়া যায় যারা চন্ডাল উপজাতি নামে পরিচিত। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মিঃ ওয়াইজ নগরী ও পার্শ্ববর্ত্বী এলাকায় একটি পরিসংখ্যান চালিয়ে পাঁচ হাজার চন্ডালের সন্ধান পেয়েছিলেন। শেষ সামন্ত শাসন রানী ভবানীকে পরাজিত করে পালোয়ান গাজী সমগ্র গাজীপুরে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তারই পুত্র কারফরমা শাহ গাজী অত্র এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন এবং ইসলাম ধর্ম দ্রুত প্রসারিত হতে শুরু করে। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী এলাকায় খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারে সুৃচনা হয়। বর্তমানে দেশের উলে­খযোগ্য সংখ্যক খ্রীষ্টান কালীগঞ্জ এলাকায় বাস করে। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্ঠান জনগোষ্টীর বাইরেও এই উপজেলায় কিছু আদিবাসী যেমন নিষাদ, ডোম, সাওতাল, কোচ, রাজবংশী, মান্দী সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ মিলত যাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এছাড়াও পূবাইল ব্রিজের নিচে নৌকায় বসকাসকারী একশ্রেণীর বেদে সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব লক্ষণীয়, যারা মুসলমান সম্প্রদায়ভূক্ত অথচ জাতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে আদিবাসী।   

 

নদ-নদী, খাল বিল

     শীতলক্ষ্যা নদীঃরুপার মত স্বচ্ছ জলরাশিকে যে নদী ধারণ করে আছে তাই শীতলক্ষ্যা। উৎসমুখ ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ তীরস্থ টোক নয়ন বাজারের নিকট খারসাদী (গার নদী) নামক স্থানে, এরপর একডালা হয়ে কালীগঞ্জ সীমানায় পড়েছে। কালীগঞ্জের পূর্ব ও দক্ষিন সীমান্তে নির্দেশ করে মোক্তারপুৃর, জামালপুর, বাহাদুরসাদী, কালীগঞ্জ, তুমুলিয়া ও নাগরী ইউনিয়নের পার্শ্ব দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। এ সময় এর প্রবাহ মধ্যগতির রুপ পরিগ্রহ করেছে। সুতী, বালু, চিলাই ইত্যাদি শীতলক্ষার উপনদী। পূর্বে এই নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে পলাশ উপজেলায় প্রচুর শিল্প গড়ে ওঠায় শিল্পবর্জের কারণে মাছ কম পাওয়া যায়। 

 

    বালু নদী:টঙ্গী খালের পর অর্থাৎ কহরদরিয়ার পূর্বাংশে রেলসেতুর নিকট হতে পূবাইল উলুখোলা হয়ে ডেমরার নিকট শীলক্ষায় পতিত স্রোত ধারার নামই বালু নদী। ইহা মূলতঃ টঙ্গী খালের বর্ধিতাংশ যা তুরাগ ও শীতলক্ষা নদীর মধ্যে একটি সংযোগ নদী হিসাবে কাজ করছে। বালু নদী আরও দক্ষিণে কালীগঞ্জ রেল স্টেশনের পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত ক্ষুদ্র খাল দ্বারা কালীগঞ্জের নিকট লক্ষ্যার সাথে যুক্ত।

 

   পারুলীঃ জেলার অন্য একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর নাম পারুলী। এই পারুলী নদীর তীরেই এক কালের ভাওয়ালের চেদী রাজ্যের রাজধানী চিনাশুখানিয়া অবস্থিত। বর্তমানে নদীটির পূর্বতীরে গাজীপুর জেলার বিখ্যাত রাজবাড়ী বাজার অবস্থিত। নদীটি বর্মী বাজারের নিকট শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরের অবনতি অংশ মাটিয়াগারা গ্রাম হতে বের হয়ে দক্ষিণ দিয়ে শেরা খাল নামে প্রবাহিত হয়ে বাউনী গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে পারুলী নাম ধারণ করেছে। পরে ইজ্জতপুরের নিকট বনের মধ্যে দিয়ে সর্পিল আকারে রাজাবাড়ী হয়ে আরো দক্ষিণে কালীগঞ্জের নরুণ গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে বিল বেলাই এ পতিত হয়েছে। 

 

  নাগদা গাংঃনাগদা বালু নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে বক্তারপুর ও জাঙ্গালীয়া ইউনিয়ন এর সীমা নির্দেশ করে পূর্বদিকে মোক্তারপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বাহাদুরসাদী হয়ে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে। এই নদীতে এখনো প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এখানে দেশের প্রথম জালের খাচাঁয় মাছ চায় আরম্ভ হয়।

 

  দুলন খাল (আঞ্চলিক দোলন)ঃকামতা গ্যাস ফিল্ডের নিকট বালু নদীতে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ পূর্ব দিকে নাগরী ইউনিয়ন অতিক্রম করে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে।

 

   ভাদার্তি খাল (আঞ্চলিক নাম তুমুলিয়া খাল বা জয়রামবেড় খাল)ঃ চিলাই নদী হতে উৎপত্তি হয়ে তুমুলিয়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে ভাদার্তী গ্রামের দক্ষিণে শীতলক্ষ্যায় পতিত।

 

   কালিয়াখালী খালঃ বেলাই বিল হতে উৎপন্ন নদীটি ক্রমশ দক্ষিণ মুখী হয়ে বক্তারপুর ইউনিয়ন হয়ে সাওরাইদ বাজারের পূর্ব দিক থেকে শুরু করে ধনপুর কালিহাতি, রাথুরা, নোয়াপাড়া, ডেমরা দিয়ে কালিয়াখালী খালটি শীতলক্ষ্যায় পতিত।

 

   বিল বেলাইঃশ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণে সদর উপজেলার বাড়িয়া ও পূবাইল ইউনিয়নের পূর্বে এবং কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালীয়া, বক্তারপুর ও তুমুলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমে ৩০ বর্গ কিঃ মিঃ ব্যপি বেলাই বিল। রাজাকালী নারায়ণ ও রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণের সময় ম্যানেজার স্টুয়ার্ড কৃষিতে সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার  জন্য বিল বেলাই এর খাল পুনঃ খনন ও সংস্কার করেন। তার নামে এখনো খালের নাম স্টুয়ার্ডের খাল। বিল বেলাই, লবলং আদি ব্রক্ষ্মপুত্রের পরিত্যক্ত খাত যা ভূ- আন্দোলনের দরুণ একটি অবনমন হিসাবে টিকে আছে। বিলে নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ পাওয়া যায়। তবে ভরাট হওয়ার দরুণ শুকনো মৌসুমে বিলটি বোরো ও আমন শস্য ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

 

          এ ছাড়াও  বিরলা, কাটাখালী খাল, লতিয়ার ভাঙ্গা খাল কালীগঞ্জের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।